সিদ্ধেশ্বরী ছিনতাই: নারীকে টেনে নেওয়ার ঘটনার পেছনের ভয়ংকর চিত্র
নিজস্ব প্রতিবেদক, স্বাধীন খবর ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, আগস্ট ৩, ২০২৫ ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, আগস্ট ৩, ২০২৫ ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সিদ্ধেশ্বরী ছিনতাই মামলার মূল অভিযুক্ত রবিউলসহ চক্রটির ভয়ংকর কর্মকাণ্ড ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।
সিদ্ধেশ্বরী ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ও দিনের সূচনা
প্রতিদিন ভোরে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে বের হতেন সৌরভ, রাজীব ও রবিউল। তাঁরা টার্গেট করতেন ঢাকায় খুব সকালে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে। এসব ছিনতাইয়ের ঘটনায় তাঁরা মোট ২৫ থেকে ৩০টি সফল অপারেশন চালিয়েছেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
তাঁদের নিয়ম ছিল—প্রতিটি ছিনতাই শেষে ব্যাগে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া। আর ব্যাগে থাকা অন্যান্য সামগ্রী সাধারণত বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দিতেন।
আলোচিত ২৬ এপ্রিলের সিদ্ধেশ্বরী ছিনতাই
ঘটনাটি ঘটে ২৬ এপ্রিল ভোরে, যখন রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর গ্রিনল্যান্ড টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক নারী। তাঁর পরনে ছিল শাড়ি, হাতে ছিল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং সঙ্গে একটি ট্রলি ব্যাগ। হঠাৎ করে সাদা রঙের একটি প্রাইভেট কার তাঁর সামনে আসে। গাড়ির সামনের বাঁ পাশের জানালা দিয়ে একজন ব্যক্তি ব্যাগে টান দিলে নারীটি পড়ে যান এবং গাড়ির সঙ্গে টেনে নেওয়া হয় তাঁকে।
এই ভয়ংকর ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।
তদন্ত শুরু ও রবিউলের স্বীকারোক্তি
৩১ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার টোকিও মার্কেটের সামনে থেকে রবিউলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিন বিকেলেই তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি এখন কারাগারে আছেন। তাঁর কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন ও সাদা রঙের প্রাইভেট কারটি উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই জানায়, দেড় বছর আগে রবিউল নিজের টাকায় প্রাইভেট কারটি কিনেছিলেন। পরে পূর্বপরিচিত রাজীব মাঝেমধ্যেই গাড়িটি ভাড়া নিতেন। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল সকালে, রাজীব, সৌরভ ও রবিউল একসঙ্গে পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে নাশতা করেন এবং এরপর ফার্মগেট, মতিঝিল ঘুরে সিদ্ধেশ্বরীতে ছিনতাই করেন।
সিদ্ধেশ্বরী ছিনতাইআরও ৩টি ছিনতাই একই দিনে
সিদ্ধেশ্বরীর ঘটনার পর তাঁরা কারওয়ান বাজার ও মালিবাগ হয়ে ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত আরও তিনটি ছিনতাই করেন। প্রত্যেক ঘটনার পেছনে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়—গাড়ি থেকে হঠাৎ ছোঁ মেরে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া।
সিদ্ধেশ্বরীর ভিকটিমের মোবাইল ফোনটি রবিউলের ভাগে পড়ে। ঘটনার পরে নারীটি গুরুতর আহত হন এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়।
আদালতের নির্দেশ ও পিবিআই তদন্ত
২৭ এপ্রিল প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট কাউসার পারভীন স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট।
পিবিআইর অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার তানজিনা আক্তারের নেতৃত্বে তদন্ত শুরু হয়। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রবিউলকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় মামলা রুজু করা হয়।
সিদ্ধেশ্বরী ছিনতাই চক্রের পেছনের কাহিনি
রবিউল রাজধানীর তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকায় ভাড়া থাকতেন। তাঁর স্থায়ী বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায়। বাকি দুই অভিযুক্ত রাজীব ও সৌরভকে গ্রেপ্তারে পিবিআই অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
ছিনতাই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ছিল। তাঁরা দিনের বেলায় সাধারণ জীবনযাপন করলেও ভোরে বের হয়ে ছিনতাই করতেন। রবিউলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোর ৪টা থেকে ৭টা পর্যন্ত তাঁরা রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ছিনতাই চালাতেন।
উপসংহার: কঠোর ব্যবস্থা জরুরি
সিদ্ধেশ্বরীর ছিনতাই কেবল একটি ঘটনা নয়—এটি ঢাকা শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন। এই ঘটনায় আমরা দেখতে পাই কীভাবে একটি সংগঠিত চক্র দিনের পর দিন অপরাধ করে যাচ্ছে। এদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করলেই কেবল সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারবেন।
স্বাধীন খবর ডটকম/আ আ